
সাংবাদিকতা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার নাম নয়; বরং সত্য অনুসন্ধান, অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং মানুষের অধিকার রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
একজন প্রকৃত সাংবাদিকের কলম চলে সত্যের সন্ধানে। সমাজের অসংগতি, দুর্নীতি, অনিয়ম, প্রতারণা ও ক্ষমতার অপব্যবহার তুলে ধরা তাঁর অন্যতম দায়িত্ব। যাঁরা সততার সঙ্গে কাজ করেন, নিজেদের কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা বজায় রাখেন এবং জনকল্যাণে ভূমিকা রাখেন, তাঁদের সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতাকে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই।
কিন্তু কারও কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠলেই অনেকে সাংবাদিককে প্রতিপক্ষ ভাবতে শুরু করেন। অথচ প্রশ্ন তোলা শত্রুতা নয়, সত্য প্রকাশ অপরাধ নয়, আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশও নয়।
সাংবাদিক কারও ব্যক্তিগত শত্রু নন; তিনি সমাজের দর্পণ। সেই দর্পণে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে কেউ আত্মসমালোচনা করেন, আবার কেউ নিজের ভুল আড়াল করতে দর্পণটিকেই ভেঙে ফেলতে চান। কিন্তু বাস্তবতাকে আড়াল করার চেষ্টা করলেই সত্য মুছে যায় না।
একজন আদর্শ সাংবাদিক কারও অন্ধ সমর্থক নন, আবার কারও অন্ধ বিরোধীও নন। তাঁর দায়বদ্ধতা সত্য, ন্যায় ও জনস্বার্থের প্রতি। তিনি যেমন অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লিখবেন, তেমনি ভালো কাজের প্রশংসা করতেও দ্বিধা করবেন না। কারণ, বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি হলো সত্যনিষ্ঠা, নিরপেক্ষতা ও ন্যায়বোধ।
তাই সাংবাদিকের প্রশ্নে বিরক্ত হওয়ার আগে নিজের বিবেককে প্রশ্ন করা উচিত। নিজের কাজ স্বচ্ছ হলে, কর্মকাণ্ডে সততা থাকলে এবং জনস্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকলে সত্যনিষ্ঠ অনুসন্ধানকে ভয় পাওয়ার কী আছে?
মনে রাখতে হবে, সাংবাদিক সবার পেছনে লাগেন না। তিনি অনুসন্ধান করেন অনিয়মের, প্রশ্ন তোলেন অসংগতির বিরুদ্ধে এবং কলম ধরেন সত্য ও জনস্বার্থের পক্ষে। তাঁর উদ্দেশ্য কাউকে ব্যক্তিগতভাবে হেয় করা নয়; বরং সমাজের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা, অনিয়মের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং জনসচেতনতা সৃষ্টি করা।
তবে সাংবাদিকতার স্বাধীনতার পাশাপাশি দায়িত্বশীলতাও জরুরি। সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখা একজন সাংবাদিকের পেশাগত দায়িত্ব। একইভাবে, কোনো সংবাদ নিয়ে আপত্তি থাকলে তার জবাব হওয়া উচিত যুক্তি, তথ্য ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে—হুমকি, অপপ্রচার কিংবা সাংবাদিকতার কাজে বাধা সৃষ্টি করে নয়।
সত্যকে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, কিন্তু প্রশ্ন করাকে অপরাধ ভাবা উচিত নয়। সমালোচনা থেকে শিক্ষা নেওয়ার মানসিকতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি সাংবাদিকেরও উচিত প্রমাণ ও তথ্যের ভিত্তিতে দায়িত্বশীলভাবে সংবাদ পরিবেশন করা।
পরিশেষে, সাংবাদিকতা কারও ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার নয়; এটি জনগণের কাছে সত্য তুলে ধরার একটি দায়িত্ব। কেউ পছন্দ করুক কিংবা না করুক, সত্যের অনুসন্ধান, অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং জনস্বার্থ রক্ষায় সাংবাদিকের কলম চলুক নির্ভীকভাবে, দায়িত্বশীলতার সঙ্গে।
সাংবাদিক সবার পেছনে লাগেন না; তিনি সত্যের পেছনে ছুটে চলেন।