
পাবনায় এক সাংবাদিককে ধর্ষণ মামলায় ফাঁসানোর ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠার পর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাশিদুল ইসলামকে বদলি করা হয়েছে। সাংবাদিকদের প্রতিবাদ, মানববন্ধন ও প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার পরদিনই তাকে পাবনা থেকে রংপুর রেঞ্জে সংযুক্ত করা হয়।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) পুলিশ সদর দপ্তরের অ্যাডিশনাল ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির স্বাক্ষরিত এক আদেশে এ বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। পুলিশ সদর দপ্তরের আদেশে জনস্বার্থে তাকে রংপুর রেঞ্জে সংযুক্ত করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আদেশ অনুযায়ী, আগামী ১৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তাকে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের জন্য প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র নিতে হবে। অন্যথায় ২০ সেপ্টেম্বর থেকে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত বলে গণ্য হবেন।
যে অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা:
সম্প্রতি পাবনায় নাফিসা নামের এক তরুণী পাবনা প্রেস ক্লাবের সম্পাদক জহুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ করেন। অভিযোগের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। পরে ওই তরুণী পাবনা সদর থানায় অভিযোগও করেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তীতে ওই তরুণী ভিডিওবার্তা ও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, তাকে জিম্মি করে ওই অভিযোগ দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। তার দাবি অনুযায়ী, বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি তাকে চাপ প্রয়োগ করেন এবং ডিবি কার্যালয়ে তার বক্তব্যের ভিডিও ধারণ করা হয়। জিম্মিদশা থেকে বের হওয়ার পর তিনি থানায় দেওয়া অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেন বলেও প্রতিবেদনে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের পূর্ণ সত্যতা নির্ধারণে তদন্ত প্রয়োজন।
ডিবি ওসির বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের অভিযোগ:
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর পাবনার সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। সাংবাদিক নেতাদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি দপ্তরকে ব্যবহার করে একজন সাংবাদিককে হয়রানি এবং তার বিরুদ্ধে সাজানো অভিযোগ তৈরির ঘটনায় ডিবির ওসি রাশিদুল ইসলামের ভূমিকা ছিল। সাংবাদিকদের আরও অভিযোগ, স্থানীয় একটি চক্রের নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে সাংবাদিকরা অবস্থান নেওয়ায় তাদের চাপে রাখার উদ্দেশ্যে এই ঘটনা ঘটানো হয়ে থাকতে পারে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য বা তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম, পরদিনই বদলি:
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) পাবনা প্রেস ক্লাবের উদ্যোগে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ডিবি ওসি রাশিদুল ইসলামের প্রত্যাহার এবং তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়। এ সময় সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে পাবনার শতাধিক সংবাদকর্মী পুলিশ সুপারের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে অভিযোগের তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অপসারণের দাবি জানান। এর পরদিনই পুলিশ সদর দপ্তর থেকে রাশিদুল ইসলামকে রংপুর রেঞ্জে সংযুক্ত করার আদেশ আসে।
তদন্ত কমিটি গঠন:
পাবনার পুলিশ সুপার আবু আশ্রাফ জানিয়েছেন, ডিবি ওসি রাশিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ যাচাই করতে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কার্যক্রম চলমান থাকার মধ্যেই পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বদলির আদেশ এসেছে। অর্থাৎ বদলি হলেও অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা বা সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা সম্পর্কে চূড়ান্তভাবে কী পাওয়া যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সাংবাদিকদের প্রতিক্রিয়া:
পাবনা প্রেস ক্লাবের সভাপতি আখতারুজ্জামান বলেন, আইন লঙ্ঘন করে ডিবি ওসি অন্যায় কাজে প্রশ্রয় ও মদদ দিয়েছেন—এমন অভিযোগের ভিত্তিতেই তারা ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। তিনি ওসির বদলিকে সাংবাদিকদের দাবির প্রতি প্রশাসনের সাড়া হিসেবে দেখলেও তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে কোনো পুলিশ কর্মকর্তা যেন সাংবাদিকদের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করতে না পারেন, সে বিষয়েও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরদারি চেয়েছেন।
এখন তদন্তের অপেক্ষা:
একজন সাংবাদিককে ধর্ষণের মতো গুরুতর অভিযোগে ফাঁসানোর চেষ্টা হয়েছিল কি না, ডিবি কার্যালয়কে এ ঘটনায় ব্যবহার করা হয়েছিল কি না এবং পুলিশের কোনো কর্মকর্তা এতে জড়িত ছিলেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়ার কথা। এদিকে বদলির আদেশের পর পাবনার সাংবাদিক মহলে স্বস্তি দেখা গেলেও তারা বলছেন, শুধু বদলি নয়, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।