
রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার চাঁইসাড়া গ্রামে এক মাছ ব্যবসায়ীকে মবের কবলে ফেলে পুলিশের উপস্থিতিতেই ফাঁকা চেক ও নন-জুডিসিয়াল স্ট্যাম্পে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি এলাকাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে।
ভুক্তভোগী মাছ ব্যবসায়ী আসাদুল ইসলামের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী মহল তাঁর কাছে চাঁদা দাবি করে আসছিল। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় তাঁকে পরিকল্পিতভাবে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখা হয়। পরে পুলিশের সামনেই ফাঁকা চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর দিতে বাধ্য করা হয়।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে একই গ্রামের হাসান সরদার, মাসুদ রানা ও আশরাফুল ইসলাম আসাদুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে গ্রামের অপরপ্রান্তের একটি বাড়িতে আটকে রাখেন। সন্ধ্যার দিকে তাঁকে প্রকাশ্যে আনা হলে সেখানে প্রায় ১২০ থেকে ১৩০ জনের একটি মব জড়ো হয়।
খবর পেয়ে রাতে হাটগাঙ্গোপাড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে ব্যবসায়ীকে উদ্ধার করার পরিবর্তে মবের দাবির প্রতি নমনীয় অবস্থান গ্রহণ করে।
একপর্যায়ে পুলিশের উপস্থিতিতেই আসাদুল ইসলামের বাড়ি থেকে জনতা ব্যাংকের চেকবই আনা হয়। এরপর তাঁর কাছ থেকে তিনটি ফাঁকা চেক এবং ৩০০ টাকার তিনটি নন-জুডিসিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। পরে ওই চেক ও স্ট্যাম্প মবের নেতৃত্বে থাকা হাসান সরদারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। রাত প্রায় নয়টার দিকে পুলিশ আসাদুল ইসলামকে তাঁর বাড়িতে পৌঁছে দেয়।
আসাদুল ইসলাম বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে আমার কাছে চাঁদা দাবি করা হচ্ছিল। আমি টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় পরিকল্পিতভাবে আমাকে আটকে রেখে পুলিশের সামনেই ফাঁকা চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিতে বাধ্য করা হয়েছে।”
তিনি জানান, স্থানীয় কোলাবিল মাছচাষ প্রকল্পে তিনি আগে কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করতেন। প্রায় নয় মাস আগে তিনি হিসাব বুঝিয়ে দিয়ে দায়িত্ব ছেড়ে দেন। বর্তমানে ওই দায়িত্বে রয়েছেন হাসান সরদার।
অভিযোগের বিষয়ে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে হাসান সরদার বলেন, “যা হয়েছে, পুলিশের সামনেই হয়েছে। পুলিশ উপস্থিত থেকেই সব করেছে।”
মবের সঙ্গে জড়িত কয়েকজন ব্যক্তি দাবি করেন, আসাদুল ইসলাম মাছচাষ প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে তাঁরা শুনেছেন। তবে এ বিষয়ে থানায় কোনো মামলা বা লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি বলেও তাঁরা স্বীকার করেন।
ঘটনার সময় উপস্থিত থাকা হাটগাঙ্গোপাড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আবদুল মান্নান এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দিয়ে ফোন কেটে দেন।
স্থানীয় নরদাশ ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমি নিজেও অবাক হয়েছি। মব তৈরি করে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, পুলিশ ব্যবসায়ীকে উদ্ধার না করে উল্টো বাড়ি থেকে চেক এনে ফাঁকা স্বাক্ষর নেওয়ার ঘটনায় সহযোগিতা করেছে।”
এ ঘটনায় এলাকাজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, আইনের শাসন যেখানে নিশ্চিত হওয়ার কথা, সেখানে পুলিশের উপস্থিতিতেই যদি মব বিচার ও জোরপূর্বক স্বাক্ষর আদায়ের মতো ঘটনা ঘটে, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় নিরাপত্তা পাবে?