বিমান দুর্ঘটনার প্রেক্ষাপটে এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা, উপদেষ্টাদের বিপরীত বক্তব্য এবং প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ তহবিলের পোস্ট নিয়ে সমালোচনার মধ্যে সরকারের কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতা ও দায়িত্বহীনতার অভিযোগ উঠেছে। এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দেখা দেয় অস্থিরতা ও ক্ষোভ।
বিশেষজ্ঞ ও রাজনীতিবিদদের মতে, সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সময়ক্ষেপণ, স্বচ্ছতার অভাব এবং দায়িত্বশীল আচরণের ঘাটতি ক্রমাগত জনমনে হতাশা ও শঙ্কা তৈরি করছে। মঙ্গলবার রাজধানীর সচিবালয় এলাকায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ এবং শিক্ষাসচিব প্রত্যাহার-ঘোষণাকে ঘিরে উদ্ভূত পরিস্থিতি এর বড় প্রমাণ।
মাইলস্টোন দুর্ঘটনার পর সিদ্ধান্তহীনতা
২১ জুলাই রাতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর পরদিনের (২২ জুলাই) এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিতের দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে রাত তিনটা পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসায় পরীক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হয় বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ। এক পর্যায়ে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলম তার ফেসবুক পেজে জানিয়ে দেন যে শিক্ষা উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনা করে পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে আরেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীবও বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
তবে এরপরও শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা বোর্ডের পক্ষ থেকে রাতভর কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি। পরদিন সকালে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় ও আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা আসে।
বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও উত্তেজনা
পরীক্ষা স্থগিত নিয়ে বিভ্রান্তি ও অসন্তোষ থেকে মঙ্গলবার সচিবালয় এলাকায় শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। তারা শিক্ষা উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করে সচিবালয়ের সামনে অবস্থান নেয়। এক পর্যায়ে বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেয়। শিক্ষার্থীরা সচিবালয়ের ভেতরে প্রবেশ করে ভাঙচুর শুরু করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ত্রাণ তহবিলের বিতর্কিত আহ্বান
বিমান দুর্ঘটনার ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার জন্য প্রধান উপদেষ্টার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে একটি ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে অর্থ প্রদানের আহ্বান জানানো হয়। এতে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার পর পোস্টটি সরিয়ে নেওয়া হয়।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “সরকারের দায়িত্বশীল আচরণ সঠিক সময়ে না থাকায় পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। উপদেষ্টাদের মধ্যেও সমন্বয় নেই, যা জাতির জন্য দুশ্চিন্তার বিষয়।”
তিনি আরও বলেন, “মাইলস্টোনের শিক্ষার্থীদের ছয় দফা দাবির প্রতি আমরা সংহতি জানাই। বিশেষ করে শিক্ষা উপদেষ্টার দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ জাতিকে হতাশ করেছে।”
অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট পিনাকী ভট্টাচার্য তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “ইন্টেরিম গেসে পাগল হইয়া। কাল পরীক্ষা পেছনের একটা সিদ্ধান্ত নিতেই এরা রাত পার করে ব্লান্ডার করেছে।”
সিপিবি’র উদ্বেগ
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, “সরকারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই সমন্বয়হীনতা রয়েছে। একেক সময় একেক ধরনের বক্তব্য আসে। এতে করে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও ক্ষোভ বাড়ছে।”
তিনি আরও বলেন, “দ্রুত সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না হলে এ ধরনের অস্থিরতা আরও বাড়বে।”