আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ভারত সরকার আইনগত প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে শত শত বাঙালি মুসলিমকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে। সংস্থাটি বলছে, এদের অনেকেই প্রকৃতপক্ষে ভারতীয় নাগরিক, যারা সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন।
এইচআরডব্লিউ জানায়, চলতি বছরের মে মাস থেকে ভারতের হিন্দুত্ববাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সরকার বাংলাদেশে বাঙালি মুসলিমদের ‘পুশ-আউট’ প্রক্রিয়া আরও জোরালোভাবে শুরু করে। যদিও সরকার দাবি করছে এটি অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, এসব কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক মানবাধিকার এবং ভারতের নিজস্ব সংবিধান লঙ্ঘন করছে।
এইচআরডব্লিউ-এর এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক এলেইন পিয়ারসন বলেন,
“বিজেপি নির্বিচারে বাঙালি মুসলিমদের— এমনকি ভারতীয় নাগরিকদেরও— দেশ থেকে বের করে দিয়ে বৈষম্যকে উসকে দিচ্ছে। এ ধরনের পুশ-আউট প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।”
সংস্থাটি জানায়, জুন মাসে তারা ১৮ জনের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন জোর করে বাংলাদেশে পাঠানোর পর পুনরায় ফিরে আসা ভারতীয় নাগরিক, আটক হওয়া ব্যক্তিদের আত্মীয় এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা। গত ৮ জুলাই ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি প্রতিবেদন জমা দিলেও এখনো কোনো সাড়া মেলেনি।
বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তথ্যমতে, ৭ মে থেকে ১৫ জুনের মধ্যে ভারত দেড় হাজারের বেশি মুসলিম নারী, পুরুষ ও শিশুকে ‘পুশ-ইন’ করেছে। তাদের মধ্যে অন্তত ১০০ জন রোহিঙ্গা, যারা মায়ানমার থেকে পালিয়ে এসেছিল।
এইচআরডব্লিউ’র প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, আসাম, উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, গুজরাট, ওড়িশা ও রাজস্থান রাজ্যের পুলিশ ও প্রশাসন মূলত দরিদ্র মুসলিম শ্রমিকদের আটক করে বিএসএফের কাছে তুলে দিচ্ছে। অনেক সময় নাগরিকত্ব যাচাই না করেই তাদের বাংলাদেশের দিকে ঠেলে পাঠানো হচ্ছে। কিছু ঘটনায় মারধর ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের কথাও বলা হয়েছে।
একটি নজির হিসেবে আসামের সাবেক স্কুলশিক্ষক খায়রুল ইসলাম (৫১) জানান,
> “২৬ মে বিএসএফ সদস্যরা আমাকে হাত বেঁধে মুখ চেপে ধরে জোর করে বাংলাদেশে পাঠায়। আমি বাধা দিলে আমাকে মারধর করে এবং চারবার রাবার বুলেট ছোড়ে। দুই সপ্তাহ পর আমি কোনোভাবে ভারতে ফিরে আসি।”
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কাউকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে অন্য দেশে পাঠানো মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ভারত সরকারকে অবশ্যই প্রত্যেক নাগরিককে সঠিক আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ দিতে হবে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে হবে, এবং তাদের আইনি সহায়তা ও আপিলের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
সংস্থাটি ভারত সরকারের প্রতি অবিলম্বে এই পুশ-আউট কার্যক্রম বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।