
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো কমপ্লেক্সের আমদানি অংশে অগ্নিকাণ্ড এবং এর কয়েক ঘণ্টা আগে মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের পাশের ভবনে আগুন লাগার ঘটনায় সরকারের উচ্চপর্যায়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। চলমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার হঠাৎ করেই “সতর্ক অবস্থান” নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
তবে বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক এসব ঘটনা শুধু অঘটন নয়—এগুলো প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা তদারকির ঘাটতির প্রতিফলন হতে পারে। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকার পরও একের পর এক অগ্নিকাণ্ড প্রশ্ন তুলছে বিভিন্ন মহলে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্বে থাকা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের ব্যাপারে প্রশ্ন উঠেছে—বিগত শাসনের প্রভাব এখনো সরকারি প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়ে গেছে কি না।
সরকারের অভ্যন্তরীণ সূত্র ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সচিবালয় থেকে শুরু করে পুলিশ প্রশাসন পর্যন্ত বহু কর্মকর্তা এখনো পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া বা পদোন্নতি পাওয়া ব্যক্তিই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন। বিশেষ করে গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই ও পুলিশের মধ্যে এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মকর্তা রয়েছেন যারা আওয়ামী শাসনামলে পদোন্নতি পেয়েছিলেন বা প্রভাবশালী ছিলেন।
একজন অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “বিগত সরকারের ঘনিষ্ঠ অনেক কর্মকর্তা এখনো প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আছেন। ফলে সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দ্বিধা বা বিলম্ব দেখা দিচ্ছে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইতিহাসে ক্ষমতা পরিবর্তনের সময় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আসে ‘অভ্যন্তরীণ আনুগত্য ও প্রশাসনিক পুনর্গঠন’ থেকে। রাজা-বাদশাহদের যুগে ক্ষমতা বদলের পর পুরনো শাসকের ঘনিষ্ঠদের সরিয়ে দেওয়ার প্রবণতা ছিল রাজনৈতিক নিরাপত্তা রক্ষার কৌশল হিসেবে। আধুনিক রাষ্ট্রে সে ধরনের নির্মমতা না থাকলেও, প্রশাসনিক শুদ্ধি বা সংস্কার এখনো জরুরি।
ইতিহাসবিদদের মতে, নতুন শাসন ব্যবস্থায় পূর্ববর্তী সরকারের অনুগতদের চিহ্নিত করা ও সীমিত দায়িত্বে রাখা অনেক সময় রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে। কিন্তু বর্তমান সরকারের ক্ষেত্রে এই পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয় বলে অভিযোগ উঠছে।
সরকার ঘনিষ্ঠ এক সূত্র জানায়, পুলিশ হেডকোয়ার্টারে এমন বহু কর্মকর্তা আছেন যাদের বিরুদ্ধে পূর্ববর্তী সময়ে রাজনৈতিক পক্ষপাত বা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল, কিন্তু এখনো তারা দায়িত্বে রয়েছেন। অন্যদিকে, বিগত সরকারের সময়ে অন্যায়ভাবে চাকরি হারানো বা বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়া কর্মকর্তারা পুনর্বহালের অপেক্ষায় রয়েছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের উচিত হবে প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা, গোয়েন্দা সংস্থার ব্যর্থতা মূল্যায়ন করা এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের স্পষ্ট বার্তা দেওয়া—রাষ্ট্রের স্বার্থে ব্যর্থতা বা অবহেলার পরিণতি কী হতে পারে।
একজন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক বলেন, “অধ্যাপক ইউনূসের সরকার যদি মনে করে কেবল নৈতিক অবস্থান দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে, তাহলে সেটি বাস্তবতার সঙ্গে যায় না। প্রশাসনের ভেতরের কাঠামোগত আনুগত্য ভাঙা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে নির্বাচন ঘিরে অস্থিতিশীলতা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে তারা আশা প্রকাশ করেছেন, সরকার অগ্নিকাণ্ডসহ সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে সতর্কবার্তা হিসেবে নিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।