রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে স্থানীয় ক্ষমতাশালী ও দালালচক্রের হুমকি—বাংলাদেশের সংবাদকর্মীরা পড়েছেন চরম অনিশ্চয়তায়।
পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হত্যা, গুম, নির্যাতন ও মামলার শিকার হচ্ছেন বাংলাদেশের সাংবাদিকরা। রাজনৈতিক দলীয় কারণে, নিজ এলাকার প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের জেরে, কিংবা ব্যক্তিগত শত্রুতার বশে—তিনটি কারণেই হয়ে পড়ছেন সহিংসতার শিকার সংবাদকর্মীরা।
চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে নির্যাতন ও মৃত্যুহুমকিসহ অন্তত ১০৬টি সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা রেকর্ড করেছে অধিকার সংস্থা ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র (ASK)’। শুধু জুলাই মাসেই সারা দেশে সাংবাদিকদের ওপর ৩৯টি হামলার ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে রয়েছে ১৯টি মৃত্যুহুমকি, ১১টি শারীরিক হামলা এবং ৩টি গুলি ও হত্যাচেষ্টা। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) সংবাদকর্মী ও গণমাধ্যমের ওপর মোট ৯৪টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নাজেহাল হচ্ছেন সাংবাদিকরা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ৫০০-র বেশি মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তার হয়েছেন কমপক্ষে ৫০ জন এবং প্রাণ হারিয়েছেন ১৩ জন সাংবাদিক। ২০২৫ সালে দেশে পাঁচ সাংবাদিক খুন হন। ২০২৬ সালের শুরুতেই যশোরের সিনিয়র সাংবাদিক রণ প্রতাপ বীরাজ গুলিতে নিহত হন, যিনি চলতি বছরের বিশ্বের প্রথম নিহত সাংবাদিক। হিন্দু সম্প্রদায়ের এই সাংবাদিক দীর্ঘদিন ধরে উগ্রপন্থীদের কাছে ‘সুরক্ষা টাকা’ দিয়ে আসছিলেন। সম্প্রতি শ্রীমঙ্গলে এক সাংবাদিকসহ ছয়জনকে হত্যা ও লাশ গুমের হুমকির ঘটনাও সামনে এসেছে, যা এলাকায় চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনায় বিচারের অভাবে ‘দণ্ডহীনতার সংস্কৃতি’ তৈরি হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা ধরা পড়েন না বা গ্রেপ্তার হলেও শাস্তি পান না। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ)-এর ২০২৬ সালের সংবাদ স্বাধীনতা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২তম, যা গতবারের তুলনায় তিন ধাপ নিচে নেমেছে।
গবেষণায় উঠে এসেছে, সাংবাদিকরা কেবল মাদক পাচার, দুর্নীতি বা সরকারি প্রকল্পে অনিয়মের খবর করতে গিয়েই সংশ্লিষ্টদের হামলার শিকার হচ্ছেন না; পেশাগত দায়িত্ব পালনকালেই তারা শিকার হচ্ছেন। ভূমিদস্যু, বালু ও চোরাই মাদক ব্যবসায়ীদের সংবাদ প্রকাশকে কেন্দ্র করেই অধিকাংশ হামলার ঘটনা ঘটে।
বাংলাদেশের সংবাদকর্মীরা আজ এক অনিশ্চিত ও আতঙ্কজনক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দণ্ডহীনতার এই সংস্কৃতি ভাঙতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পাশাপাশি দেশীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলোও এই পরিস্থিতিতে নজরদারি জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে।