সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর-শান্তিগঞ্জ এলাকা নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ-৩ আসনে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও জল্পনা-কল্পনা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন আট দলীয় জোটের প্রার্থী কে হবেন—এই প্রশ্নে স্থানীয় রাজনীতি এখন বেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
এই আসনে জোটের মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন দুইজন প্রভাবশালী নেতা—জামায়াতে ইসলামীর অ্যাডভোকেট ইয়াছিন খান এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস-এর অ্যাডভোকেট মাওলানা শাহীনুর পাশা। তবে শনিবার পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন জোটের সংশ্লিষ্ট নেতারা।
শনিবার সিলেটে অনুষ্ঠিত আট দলীয় জোটের সমাবেশকে কেন্দ্র করে উভয় মনোনয়ন প্রত্যাশী নেতাই নিজেদের অবস্থান জোরালো করতে নানা কৌশল অবলম্বন করেন। সমাবেশের আগে ও পরে কেন্দ্রীয় নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য তারা নিজ নিজ পক্ষ থেকে সক্রিয় তৎপরতা চালান।
জগন্নাথপুর উপজেলার পাটলী গ্রামের বাসিন্দা মাওলানা শাহীনুর পাশা দীর্ঘদিন ধরে দেশের রাজনীতিতে সক্রিয়। একসময় তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম-এর কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন এবং সংগঠনের প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সুনামগঞ্জ-৩ আসন থেকে জমিয়তের প্রার্থী হয়ে চারবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। ২০০৫ সালের নির্বাচনে বিএনপি জোটের প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং প্রায় এক বছর দায়িত্ব পালন করেন।
তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে বিতর্কও রয়েছে। ২০২৩ সালের ২৫ নভেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত হন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর তিনি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসে যোগ দেন। বর্তমানে দলটি আট দলীয় জোটের শরিক হওয়ায় তিনি এই জোটের মনোনয়ন পেতে সক্রিয়ভাবে মাঠে কাজ করছেন। গত ছয় মাস ধরে তিনি নির্বাচনী এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ, সভা-সমাবেশ চালিয়ে যাচ্ছেন।
নিজের মনোনয়ন প্রত্যাশা সম্পর্কে শাহীনুর পাশা বলেন, “আমি ছয়বার জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েছি এবং একবার এমপি ছিলাম। জোটের অন্যান্য প্রার্থীদের তুলনায় আমার অভিজ্ঞতা বেশি। ৩৫ বছর ধরে মাঠে আছি, এমন কোনো গ্রাম নেই যেখানে আমার কর্মী-সমর্থক নেই। তাই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই জোট আমাকে মনোনয়ন দেবে বলে আশা করছি।”
অন্যদিকে জগন্নাথপুরের পাইলগাঁও ইউনিয়নের খানপুর গ্রামের বাসিন্দা অ্যাডভোকেট ইয়াছিন খান-ও শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। তিনি জামায়াতে ইসলামীর মজলিশে শুরার সদস্য এবং সিলেট মহানগরের পেশাজীবী থানা আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি তিনি সিলেট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের একজন পরিচিত আইনজীবী।
গত প্রায় এক বছর ধরে ইয়াছিন খান নির্বাচনী এলাকায় নিয়মিত গণসংযোগ করে আসছেন। তিনি বলেন, “আমরা দুজনই মাঠে কাজ করছি। তবে দল ও জোট নিশ্চয়ই ত্যাগ, আদর্শ ও গ্রহণযোগ্যতার বিষয় বিবেচনা করেই মনোনয়ন দেবে।” তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী শাহীনুর পাশার অতীত রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এবং বলেন, “জনগণ তাকে কতটা গ্রহণ করবে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।”
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর তোফায়েল আহমেদ খান বলেন, “সুনামগঞ্জ-৩ আসনে এখনো জোটের প্রার্থী চূড়ান্ত হয়নি। খুব শিগগিরই কেন্দ্র থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে।”
এদিকে নির্বাচনী এলাকায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও কৌতূহল ও আগ্রহ বাড়ছে—শেষ পর্যন্ত কে পাচ্ছেন আট দলীয় জোটের টিকিট। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জোটের অভ্যন্তরীণ সমঝোতা, প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা, অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা এবং স্থানীয় প্রভাব—সবকিছু বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে সুনামগঞ্জ-৩ আসনে আট দলীয় জোটের প্রার্থী ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক উত্তেজনা ও আলোচনা আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।